প্রেসিডেন্ট জিয়ার ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্ব


যুগে যুগে যেসব মনীষী জন্মগ্রহণ করেছেন তাঁদের নৈতিক চরিত্রের দৃঢ়তা এবং সততা বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়। প্রেসিডেন্ট জিয়ার ব্যাপারেও এর কোন ব্যতিক্রম ঘটেনি। কোন মানুষের ব্যক্তিত্বের উপর তার নেতৃত্বও নির্ভর করে। যে ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব খুব প্রখর তার কাছে নেতৃত্বও ধরা পড়ে। অন্য কথায় বলা যায় যিনি যে সমস্ত গুণের অধিকারী হবেন তার নেতৃত্বের ভিতর সেসব গুণেরই প্রকাশ ঘটে। আরও সহজ করে বলতে গেলে বলতে হয়, ব্যক্তিত্ব হচ্ছে ব্যক্তির চারিত্রিক দৃঢ়তা, সততা এবং আশা-আকাঙ্ক্ষা ও লক্ষ্যের প্রতিফলন। আর এগুলোর উপর নির্ভর করে সেই ব্যক্তি যদি কোন কাজের নেতৃত্ব দেন তাহলে তার নেতৃত্ব সেই কাজের মাধ্যমে ফুটে ওঠে। প্রেসিডেন্ট জিয়ার ব্যক্তিত্ব ছিল দীপ্তিময় মধ্যাহ্নের সূর্যালোকের মতো প্রখর। প্রেসিডেন্ট জিয়ার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে বলা যায় তিনি ছিলেন অসম সাহসী যোদ্ধা, ধীর স্থির বুদ্ধিদীপ্ত এবং কঠোর কর্মঠ এক অসাধারণ দেশপ্রেমিক। দেশপ্রেমে তাঁর জুড়ি কেউ ছিল না। প্রেসিডেন্ট জিয়ার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক অধ্যাপক আবদুল গফুর বলেন-
 
“মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল, হুজুর আপনাকে তো সবসময়ই সরকার বিরোধী ভূমিকায় দেখা যায়। এমনকি যখন আপনার নিজের দল মন্ত্রিসভা গঠন করেছিল, তখনও আপনি একই জনসভায় দাঁড়িয়ে আপনার পাশে বসা মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বক্তৃতা দিয়েছেন। অথচ দেখা যায়, আপনি জিয়াউর রহামানের প্রতি যথেষ্ঠ সহানুভূতিশীল। জিয়ার প্রতি আপনার এই দুর্বলতার কারণ কি? মওলানা সাহেব জবাবে বলেছিলেন, দেখ, তোমরা তো রাজনীতি দেখছ বহুদিন ধরে। আমার রাজনীতির জীবনও অনেক বেশিদিনের। আমার এই দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এদেশে এমন একটা লোক তো কখনও দেখলাম না, যে ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছে নিজেকে দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতির উর্ধ্বে রাখতে পেরেছে। আমাকে একটা উদাহরণ দেখাও।”
 
বাস্তবিক এই একটি ব্যাপারে অন্তত জিয়াউর রহমান ছিলেন একেবারে অনন্য, এমনকি তাঁর শত্রুও কখনও তাঁর সম্পর্কে এ ব্যাপারে অপবাদ দিতে পারে নি। বিশ শতকের আজকের এই বাংলাদেশে রাজনীতিসহ সমাজের সর্বস্তরে নৈতিক অবক্ষয়ের যেখানে ধ্বস নেমেছে, সেখানে এমনটি কল্পনা করা অসম্ভব। অথচ জিয়ার ব্যাপারে ছিল এটা চিরন্তন সত্য। জিয়ার মৃত্যুর পূর্বে তাঁর স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও দুই পুত্রের খবর দেশবাসী জানত না বললেই চলে।
 
জিয়ার কর্মজীবনের শুরু সৈনিক হিসাবে আর অবসান রাজনীতিক হিসেবে। আমরা কম-বেশি দেশকে ভালবাসি কিন্তু জিয়ার মতো এত ব্যক্তিস্বার্থ ত্যাগ করে কাউকে দেশকে ভালবাসতে দেখিনি। প্রেসিডেন্ট জিয়া ভোগ-বিলাসী জীবন পছন্দ করতেন না। প্রেসিডেন্ট হবার পরও তিনি যে সহজ-সরল জীবন-যাপন করতেন তা এদেশে কিংবদন্তীর জন্ম দিয়েছে। প্রেসিডেন্টের পদে অধিষ্ঠিত হয়েও তিনি সেকেন্ডহ্যান্ড কাপড় পরিদান করতেন। ক্ষমতার সবটুকু নিজের হাতে থাকা সত্ত্বেও তিনি পরিবারের জন্য একটা বাড়ি পর্যন্ত করেননি। পৃথিবীতে মহৎ ব্যক্তিদের দুটো দিক থাকে, উচ্চ চিন্তা এবং সহজ-সরল জীবন। প্রেসিডেন্ট জিয়া শুধু সহজ-সরল জীবনের মূর্ত প্রতীকই ছিলেন না- দেশ ও জনগণের কল্যাণে সুউচ্চ মন, মহৎ চিন্তাও তাঁর অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য ছিল। প্রেসিডেন্ট জিয়ার নেতৃত্ব সম্পর্কে তাঁর মৃত্যুর পরও বিদেশী পর্যবেক্ষকদের মতামতের উপর দৃষ্টিপাত করলেই সহজে তাঁকে চেনা যায়। বিবিসি ও ভয়েজ অব আমেরিকা তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করে-
 
“প্রেসিডেন্ট জিয়া যখন ক্ষমতাসীন তখন সমস্যা জর্জরিত দেশের জন্য কড়াহাতে শাসনভার গ্রহণ করার প্রয়োজন ছিল এবং জনগণ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে সাদর অভ্যর্থনা জানায়। মৃদুভাষী এই সেনানায়ক কঠোর পরিশ্রমী ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দুর্নীতি থেকে পুরোপুরি মুক্ত ছিলেন। বলা উচিত দুর্নীতির জালে তাঁকে আবদ্ধ করা অসম্ভব ছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য যেসব কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, জিয়াউর রহমান দৃঢ়ভাবেই সেসব সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। জনসংখ্যার ঊর্ধ্বগতি এবং দারিদ্র্যের মতো সমস্যা হিসেবে গণ্য করেছেন এবং বলেছিলেন বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বনির্ভর হয়ে উঠতে হবে এবং সেই সঙ্গে অন্যান্য দেশের সাহায্যের উপর নির্ভরশীলতার অবসান ঘটাতে হবে। জেনারেল জিয়াউর রহমানের কর্মধারায় একটা স্বাতন্ত্র্য ছিল। পূর্বসূরিরা যা করেননি তিনি সেদিকে নজর দিয়েছিলেন। সামরিক ও বেসামরিক দফতরগুলো তিনি রাজনীতিমুক্ত করেছিলেন এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুষম নিয়মনীতির আওতায় আনা শুরু করেছিলেন। এতে করে মুদ্রাস্ফীতির চাপ কিছুটা বেড়ে যায়। তিনি ‘শান্তিপূর্ণ বিপ্লব’ নামে একটি প্রচারণা অভিযান শুরু করেন। ব্যক্তিগতভাবে গ্রামে গিয়ে তিনি ১৯ দফা কর্মসূচি তুলে ধরেন। তার মধ্যে রয়েছে খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করার শপথ গ্রহণ, জনসাধারণকে শিক্ষিত করার উদ্যোগ, পরিবার পরিকল্পনা এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ। জেনারেল জিয়াউর রহমান এক মহান প্রয়াস নিয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন দেশবাসীকে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তাঁর বিশিষ্ট ভূমিকা ছিল। ক্ষমতাসীন থাকাকালে ব্যক্তিগতভাবেও তিনি অতি সাধারণ জীবন যাপন করতেন। ওয়াশিংটন পোষ্ট পত্রিকার মতে, “তিনি (জিয়া) ছিলেন পতেঙ্গায় সমুদ্রতটে আছড়ে পড়া উত্তাল তরঙ্গের মতো প্রাণ চঞ্চল-তলাবিহীন ঝুড়িতে আরও কিছু শস্য ঢেলে দিয়ে ঝুড়ির তলা মেরামত করতে চেয়েছিলেন তিনি। “দেশব্যাপী জাগিয়ে তুলেছিলেন কর্মোদ্যম এবং কর্মযোগের এক নবজাগরণ।”
 
এই হচ্ছেন জিয়াউর রহমান, তিনি সৎ একনিষ্ঠ দেশপ্রেমিক এবং অনন্য সাধারণ এক বলিষ্ঠ কর্মী-পুরুষ। তিনি টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার বিশাল জনসমুদ্রকে দেশ গঠনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি বঙ্গভবন ছেড়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিলেন। বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে এক বিশেষ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাই আমেরিকার একটি প্রখ্যাত ও বহুল প্রচারিত পত্রিকার সম্পাদকীয় কলামে দেখা যায়-
 
“১৯৭১ সালের স্বাধীনতা লাভের পর বাইরের দুনিয়ায় বাংলাদেশ একটি আন্তর্জাতিক করুণার পাত্র হিসেবে পরিচিত হয়। বাইরের বিশ্বের লোকেরা যখন দেখত বাংলাদেশ মানে দুর্ভিক্ষ, বন্যা, জনসংখ্যার চাপ আর বিশৃংখলার দেশ; সবচেয়ে নীরবে এবং প্রায় নিঃশব্দে প্রেসিডেন্ট জিয়া বাংলাদেশের ভাগ্য পরিবর্তনের কাজ শুরু করেছিলেন। তিনি সংকল্প করেছিলেন ৯ কোটি লোক অধ্যুষিত তাঁর দেশকে খাদ্যে স্বয়ম্ভর করে তুলবেন। তিনি যে গণতন্ত্রের পথ বেছে নিয়েছিলেন তার সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত হলো সংবাদপত্র। প্রেসিডেন্ট জিয়া সংবাদপত্রের পূর্ণ স্বাধীনতা দান করেছিলেন। যেখানে বিরোধী দলগুলোর বক্তব্য ছাপা হতো। মোটকথা জিয়া সেনাবাহিনী প্রধান হওয়া সত্ত্বেও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এক অগ্র সৈনিক ছিলেন। একথা বলতে আপত্তি নেই যে, ১৯৭৫ সালের পর বাংলাদেশে যে সংকট এবং ক্রান্তিলগ্ন উপস্থিত হয়েছিল তার মোকাবিলা করা একমাত্র জিয়ার মতো ব্যক্তিত্বের পক্ষেই সম্ভব।”
 
প্রেসিডেন্ট জিয়া মাতৃভূমি শৃংখল মুক্ত করে সৈনিকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন এবং রণক্ষেত্রে যুদ্ধ করে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাই জাতি তাঁকে সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ সৈনিক হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
 
 
বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুল ওহাব