ভোট কারসাজির জন্য ইভিএম চায় সরকার : রুহুল কবির রিজভী


প্রধানমন্ত্রীর এক উপদেষ্টা ভোট কারসাজির জন্য আবারও ইভিএম বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছেন। এ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য মূলত: সরকারের ইচ্ছা পূরণেরই প্রতিফলন' বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এমন মন্তব্য করেন। সংবাদ সম্মেলনের সম্পূর্ণ বক্তব্য নিম্নরূপ। সুপ্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা, গত রাত ছিল শবে বরাতের পবিত্র রজনী। আপনারা ইবাদত-বন্দেগী করেছেন, তবু আমরা কিছু জরুরী বিষয়ে কথা বলার জন্য শুক্রবার ছুটির দিনেও আপনাদেরকে প্রেসব্রিফিংয়ে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। আপনারা কষ্ট করে প্রেসব্রিফিংয়ে উপস্থিত হয়েছেন, এজন্য সকলকে জানাচ্ছি আমার আন্তুরিক শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা। সাংবাদিক বন্ধুগণ, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা গতকাল বলেছেন, সব রাজনৈতিক দল চাইলেই আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করা হবে। এর দু’দিন আগে প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা বলেছিলেন আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে। গতকাল সিইসি’র বক্তব্যে সেটির প্রতিধ্বণি হয়েছে। বর্তমান ভোটারবিহীন সরকার বন্দুকের জোরে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে যে ভয়াবহ দু:শাসন ও অপকর্ম সংঘটন করছে, দেশজুড়ে যেভাবে লুটপাটের রাজত্ব কায়েম হয়েছে, যেভাবে গোটা দেশকে সন্ত্রাসের রাজত্ব চলছে, যেভাবে মা-বোনদের ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে তাতে ক্ষমতাসীনদের জনপ্রিয়তা এখন শুণ্যের নীচে নেমে এসেছে। আর সেজন্যই প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ভোট কারসাজির জন্য আবারও ইভিএম বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছেন। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য মূলত: সরকারের ইচ্ছা পূরণেরই প্রতিফলন। নির্বাচন নিয়ে সরকারের আগ্রাসী ষড়যন্ত্র এখনও স্বমহিমায় বিরাজমান। ইতোপূর্বে জার্মানি, আমেরিকা, ভারতসহ অনেক দেশে ইভিএম মেশিন নিয়ে বিতর্ক হওয়ায় সেখানে এই মেশিনের ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। জার্মান আদালত ২০০৯ সালে এক রায়ে বলেছে, ইভিএম মেশিন খুব সহজেই টেম্পারিং করা সম্ভব। এতে ভোট পুনর্গণনার সুযোগ নেই। তাই জার্মান আদালত ওই মেশিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। গত কয়েক দিন আগে ভারতে কিভাবে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট কারসাজির ঘটনা ঘটেছে সেটি ছবিসহ প্রকাশ করা হয়েছে। তাই বর্তমানে আবারও ইভিএম বিষয়টিকে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক জনসম্মুখে নিয়ে আসা দুরভিসন্ধিমূলক। বন্ধুরা, রমজানের আগেই নিত্যপণ্যের বাজার লাগামহীন হয়ে পড়েছে। দেশজুড়ে সন্ত্রাস, লুটপাট, আওয়ামী সন্ত্রাসীদের অরাজকতায় এমনিতে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠেছে। বর্তমান ভোটারবিহীন সরকারের পুরো সময়ই চাল-ডালসহ নিত্যপণ্যের বাজার ছিল ক্ষমতাসীনদের সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। সাধারণ মানুষের পকেট কেটে তারা হাজারো কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। রমজানকে সামনে রেখে সিন্ডিকেট চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে গেছে। সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণ না থাকায় গত এক সপ্তাহে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে দ্বিগুন। লাফিয়ে লাফিয়ে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় মানুষের জীবনে ত্রাহি অবস্থা বিরাজ করছে। মানুষের জীবন এখন বিষম মরণঘুর্ণিতে। নি:শ্বাসরোধকারী নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম নি¤œ আয়ের মানুষদেরকে প্রান্তিক অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে। রোজার আর বাকি দুই সপ্তাহ, রোজার মাসজুড়ে ইফতারি ও সাহ্রির জন্য যেসব নিত্যপণ্যের চাহিদা বরাবরই সবচেয়ে বেশি, সেগুলোর দাম রমজানের আগেভাগে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। মোটা চালের বাজারে বর্তমানে আগুন। একমাসের ব্যবধানে সব প্রকার চালের দাম কেজিতে বেড়েছে ন্যুনতম ১৫টাকা। ৪০-৪৫ টাকার কমে মোটা চাল ও ৬৫ টাকার কমে মাঝারি মানের চাল কেনা যাচ্ছেনা। মসুর ডালের দাম বেড়ে বর্তমানে কেজি প্রতি ১৪৫ টাকা হয়েছে। গত দুই সপ্তাহে মসুর ডালের দাম কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে গেছে। খুচরা বাজারে মটর ডাল বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি ৪০-৪৮ টাকায়। ইতোমধ্যে দাম বেড়েছে ৬ টাকা। ছোলার সাথে পাল্লা দিয়ে ছোলার ডালের দামও কেজিতে গড়ে ২০ থেকে ২৫ টাকা বেড়ে হয়েছে ১শ’ ২০টাকা। মুগ ডালের দাম কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১শ’ থেকে ১৩০ টাকায়। পাইকারি ও খুচরা বাজারে পেঁয়াজ ও রসুনের মূল্য বেড়েই চলেছে। দেশি পিয়াজ এখন ৫০ টাকার নীচে পাওয়া যায়না। আমদানিকৃত ও দেশীয় রসুন মানভেদে কেজি প্রতি ৩০০ টাকা, একদানার রসুন বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৩শ’ থেকে সাড়ে ৪শ’ টাকায়। গত দুই সপ্তাহে পেঁয়াজ ও রসুনের দাম মানভেদে বেড়ে গেছে ৪০ থেকে ৫০ টাকা। বাজারে শুকনো মরিচের দাম কেজিতে ইতোমধ্যে গড়ে ২০-২৫ টাকা বেড়ে হয়েছে ১৫০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা। আমদানিকৃত ও দেশীয় আদা মানভেদে বিক্রি হচ্ছে কেজি ৬০ থেকে ১১০ টাকা পর্যন্ত। চাল, ডাল, চিনি, ছোলা, পেঁয়াজ-রসুন, মরিচ, মসলাসহ নিত্য ও ভোগ্যপণ্যের ব্যবসার পেছনে সরকার দলের একেকটি ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, মিল মালিক, আড়তদার সিন্ডিকেট নেপথ্যে সক্রিয় রয়েছে। পবিত্র রমজান মাস ও শবেবরাতকে পুঁজি করে ক্রেতাসাধারণের পকেট কেটে শত শত কোটি টাকা নির্ঘাত হাতিয়ে নেয়ার টার্গেট নিয়ে বাজার কব্জায় নেয়া ও এসব নিত্যপণ্যের নিয়ন্ত্রিত বাজারকে অস্থির করে তুলেছে অতি-মুনাফালোভী চক্রগুলো। সরকারের বানিজ্য মন্ত্রী গালভরা বুলি আউড়িয়ে ছিলেন কোন পণ্যের দামই বাড়বে না। উনার বক্তব্য যে বাচালতা তা প্রমান হয়েছে। বরং সাধারণ মানুষের পকেট কাটার জন্যই সরকার রমজানের প্রাক্কালে বাজার নিয়ন্ত্রণ না করে তাদের সিন্ডিকেটকে সহায়তা করেছে। আমি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র পক্ষ থেকে নিত্য প্রয়োজনীয় সকল পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করছি এবং অবিলম্বে রমজানের প্রাক্কালে সকল নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে জোর আহবান জানাচ্ছি। সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা, দেশজুড়ে চলছে এক জ্ঞাত-অজ্ঞাত বিভিষিকা। মনে হয় চারিদিকে নিষ্ঠুর মৃত্যুর ফাঁদ পাতা, অতর্কিতে কখন যে ঘাতকরা হামলে পড়বে তা বলা মুশকিল। দেশব্যাপী চলছে নারী ও শিশু নির্যাতনের এক বিভৎসতম হিড়িক। ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ সংগঠনের নেতারা বেপরোয়া হয়ে মৃত্যুবাণে কিনে নিচ্ছে মানুষের নিরাপত্তা। ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের উচ্ছৃঙ্খল সন্তানরা এখন বেপরোয়া হয়ে নারীর প্রতি সহিংস হয়ে উঠেছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর চাপ প্রয়োগ করে এরা নারকীয় তান্ডবলীলা চালিয়ে আইনের কাছে অধরাই থেকে যাচ্ছে। সম্প্রতি ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এবং ঝিনাইদহের দু’জন নারী শ্রমিক ঢাকায় কাজের খোঁজে আসার পথে তাদের শ্লীলতাহানীসহ এরকম অসংখ্য ঘটনা দেশবাসীকে গভীর উদ্বেগ-উৎকন্ঠার মধ্যে নিপতিত করেছে। দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি বিদ্যমান বলেই অনাচারের বিষাক্ত ডালপালা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এই সংস্কৃতি পশু ও মানুষের মৌলিক পার্থক্য ঘুচিয়ে দিয়েছে। ঔদ্ধ্যত ও অপরিণামদর্শী স্বৈরশাসকের দু:শাসনের কারনেই আশকারা পেয়ে কিছু মানুষ পাশবিক কর্মকান্ডে মেতে উঠেছে। গণতন্ত্র অনুপস্থিতির কারনেই সামাজিক অপরাধ এখন ভয়াবহ রুপ নিয়েছে। কারন গণতন্ত্রের মধ্যেই অন্ত:সলিলা ফল্পুর মতো বহমান থাকে মানবতা, কান্ডজ্ঞান ও সুনাগরিক হওয়ার অধিকার। বর্তমান সরকার বিগত কয়েক বছরের দু:শাসনে দেশের মানুষকে খোয়াড়ে বন্দী অবলা প্রাণীর মতো করে রেখেছে। রাজনৈতিক কারনে বহু লোককে চাকুরিচ্যুত করা হয়েছে, রাজনৈতিক কারনে যোগ্য স্থান থেকে সরিয়ে উপেক্ষা করা হয়েছে। মামলা-হামলা, হত্যা-গুম-খুন-অপহরণের শিকার হওয়া বিএনপিসহ বিরোধী দলের হাজার হাজার পরিবারে কান্নার মাতম যেন থামছেই না। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষগুলোর ওপর এমন কোন নির্যাতন নেই যা সরকার চালায়নি। রাষ্ট্রযন্ত্রের যাঁতাকলের ভেতর দেশের জনসাধারণকে দাস হিসেবে বসবাস করতে বাধ্য করা হয়েছে। এখন মানুষের জীবন-জীবিকা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সবই এক অজানা আতঙ্কে নিমজ্জিত। এরকম একটি তমসাচ্ছন্ন নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির কারনেই সামাজিক অবক্ষয় এখন মহামারী আকার ধারণ করেছে। এসমস্ত অনাচার-অবিচার এবং দু:শাসনের কীর্তিচিহ্ন ধুলোয় নিশ্চিহ্ন করার মধ্যেই বর্তমান মহাদুর্যোগ থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায়। বর্তমান ক্ষমতাসীনরা কুৎসিত স্বেচ্ছাচারিতায় দেশকে চিরদিনের জন্য নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার দু:স্বপ্নে বিভোর। কিন্তু তারা জানে না, কত স্বৈরাচারের যুগ অস্তাচলে চলে গেছে। ধন্যবাদ সবাইকে। সবাই ভাল থাকুন। আল্লাহ হাফেজ।