দেশে কোন সরকার আছে বলে মনে হয় না : রুহুল কবির রিজভী


আইনের শাসনের অভাবে দেশে যে ভয়াবহ নিষ্ঠুরতা চলছে, যেভাবে প্রতিদিন হত্যা, গুম, অপহরণ, নারী ও শিশু নির্যাতনের যে বর্বরতা চলছে, যেভাবে এসব ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা প্রতিদিন গণমাধ্যমে প্রচার ও প্রকাশ হচ্ছে তাতে দেশে কোন সরকার আছে বলে মনে হয় না’ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এমন মন্তব্য করেন। সংবাদ সম্মেলনের সম্পূর্ণ বক্তব্য নিম্নরূপ। সুপ্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা, সংবাদ ব্রিফিংয়ে উপস্থিত হওয়ার জন্য সবার প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আজ মিথ্যা মামলায় বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী বরকত উল্লাহ বুুলু আদালতে আত্মসমর্পণ করতে গেলে তাঁর জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। এটি সরকারের প্রতিহিংসামূলক রাজনীতির আরেকটি বর্ধিত প্রকাশ। স্বেচ্ছাচার ও দুর্নীতির চাপে গণতন্ত্র ও বহুত্ত্ববাদকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে সরকার জনরোষকে আটকানোর জন্য বিএনপি’র সিনিয়র নেতাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দিয়ে কারাগারে আটকিয়ে রাখছে। বরকত উল্লাহ বুলুকে আটক সেই অশুভ পরিকল্পনারই অংশ। বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলুকে মিথ্যা মামলায় জামিন না দিয়ে কারাগারে আটকের ঘটনায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র পক্ষ থেকে আমি তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে তাঁর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে নি:শর্ত মুক্তির জোর দাবী জানাচ্ছি। বন্ধুরা, গত দু’দিন আগে সরকারের খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেছেন-চালের মূল্য বৃদ্ধির কারণ হিসেবে অসাধু মজুদদার ব্যবসায়ী ও মিল মালিকদের দায়ী। তিনি আরো বলেন, “চালের বাজারে এই দুর্যোগ মনুষ্য সৃষ্ট। হাওর অঞ্চলে বন্যায় ৩ শতাংশ অর্থাৎ ৬ লাখ মেট্রিক টন ধান নষ্ট হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন কারণে আরো ৭ লাখ মেট্রিক টন ধান নষ্ট হয়েছে। এই সুযোগে সরকারের বিরুদ্ধবাদি ব্যবসায়ী ও মিল মালিকরা আতঙ্ক সৃষ্টি করে বাজার অস্থিতিশীল করে তুলছে।” তিনি বিএনপি-কে দোষারোপ করে বলেছেন-“চালের বাজার অস্থিতিশীল করার পেছনে বিএনপি কলকাঠি নাড়ছে।” আমি কামরুল ইসলাম সাহেবের উদ্দেশ্যে বলতে চাই-হাওর অঞ্চলে তিনি ফসলহানি নিয়ে ডাহা মিথ্যাচার করেছেন। উনি ফসলহানি নিয়ে যে পরিসংখ্যান দিয়েছেন তার বাস্তবতার মোটেও মিল নেই। হাওর এলাকার প্রায় সম্পূর্ণ ফসল বিনষ্ট হয়েছে। এখন ৭৪ এর দুর্ভিক্ষের পদধ্বণি শুনতে পাওয়া যায়। বর্তমান শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতায় আসার পর বিগত ৯ বছর ধরেই চালের বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে। কারন সারাদেশটাই তো আওয়ামী লীগের কব্জার মধ্যে। এ কয়েক বছরে বিরোধী দলের অনেকর নেতাকর্মীদের জোত-জমি-ভিটা, সহায়-সম্বল কেড়ে নেয়া হয়েছে। চাকুরীজীবিদের কারে প্রতি সন্দেহ হলেই তাদেরকে জীবিকাচ্যুত করা হয়েছে। বিএনপিসহ বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীরা তো মামলা-হামলা ও গ্রেফতার নির্যতনের ভয়ে বাড়ীছাড়া এলাকাছাড়া। বিগত ৯ বছর ধরে পণ্যবাজার সিন্ডিকেটসহ ব্যবসা-বানিজ্য, সরকারী ব্যাংক-বীমা সবকিছু গ্রাস করে নেয়ার পরও নির্লজ্জভাবে খাদ্যমন্ত্রীসহ অন্যান্য মন্ত্রীরা নিজেদের অকর্মণ্যতা ও চৌর্যবৃত্তির কারনে সৃষ্ট মানুষের খাদ্য নিয়ে মহাদুর্যোগ আড়াল করার জন্য অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছেন। তাদের লুটপাটের কারনেই চাল, চিনি, লবন, ডাল, তেল, পিঁয়াজ-রসুন, মরিচ, কাঁচা তরিতরকারিসহ সকল নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম এখন লাগামহীন। চারিদিকে এখন হাহাকার চলছে। মিথ্যার বেস্যাতি করে খাদ্যমন্ত্রীরা রেহাই পাবেন না, জনগণ সবকিছুরই হিসাব কড়ায়-গন্ডায় আদায় করে নেবে। সাংবাদিক বন্ধুরা, গতকাল প্রধানমন্ত্রীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে সরকার প্রধান যে বক্তব্য রেখেছেন সেখানে কিছুটা সত্য উপলব্ধি থাকলেও বেশীর ভাগই হচ্ছে তাঁর স্বভাবসূলভ এবং অনর্গল মিথ্যাচারেরই পূণরাবৃত্তি। আমি প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলতে চাই-যারা আপনার বাবার রক্ত ডিঙ্গিয়ে শপথ নিয়েছেন এবং সেই শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছেন তারা ১৯৮১ সালের ১৭ মে থেকে কী করে আপনার অধীনে রাজনীতি করলেন, এমপি হলেন, মন্ত্রী ও উপদেষ্টা হলেন কিংবা গুরুত্বপূর্ণ পদ পেলেন ? আমরা জানি, আপনার বাবার মর্মান্তিক হত্যাকান্ডের সাথে অভিযুক্তদের ব্যাপারে আপনি ক্ষমাহীন। তাহলে এখনও কী করে আপনি এইচ টি ইমামকে সহ্য করছেন এবং মন্ত্রীর পদমর্যাদায় আপনার উপদেষ্টা বানিয়েছেন ? ঐ সময়ে প্রধান সেনাপতি ছিলেন জেনারেল শফিউল্লাহ, যার কাছে আপনার বাবা রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাহায্য চেয়েছিলেন, শফিউল্লাহ সাহেব তখন আপনার পিতাকে প্রাচীর টপকে পালিয়ে যেতে বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতিকে রক্ষা করার যার প্রধান দায়িত্ব ছিল, তিনি কী না কাপুরুষোচিত পরামর্শ দিলেন রাষ্ট্রপতিকে। সেই শফিউল্লাহ সাহেবকেও আপনি আপনার দলের টিকিটে এমপি ও একটি সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যানও বানিয়েছিলেন। বিদেশ থেকে আওয়ামী লীগের উচ্চ পর্যায়ের নেতা ও তৎকালীন জাতীয় সংসদের স্পীকার আপনার পরিবারের মর্মান্তিক হত্যাকান্ডকে সমর্থন করেছিলেন, বলেছিলেন-ফেরাউনের পতন হয়েছে, সেই আওয়ামী লীগ নেতা মালেক উকিল সাহেবের পূণরুজ্জীবিত আওয়ামী লীগেই আপনি সভাপতি হয়েছিলেন। যারা ডুগডুগি বাজাতে চেয়েছিল সেই ইনু-মতিয়া-রা এখন আপনার মন্ত্রীসভা আলোকিত করে বসে আছে। গতকাল প্রধানমন্ত্রী বলেছেন-“রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আমাকে ১৯৮১ সালে দেশে আসতে বাধা দিয়েছিল”। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে আমি বলতে চাই-তাহলে ১৭ মে ১৯৮১ তে আপনি কী করে দেশ ঢুকলেন ? তখন তো স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান সাহেবই রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন। বরং আপনি দেশের আসার তের দিনের মাথায় জিয়াউর রহমান হত্যাকান্ডের শিকার হলেন। মানুষ এও বিশ্বাস করে যে, আপনার পথের কাঁটা ভেবে আপনার পৃষ্ঠপোষকরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের শ্রেষ্ঠ সন্তান রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়েছে। সেজন্যই দেশবাসী পরবর্তীতে প্রত্যক্ষ করেছে-যখন স্বৈরাচার এরশাদ নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে বন্দুকের নলের মুখে ক্ষমতাচ্যুত করে গণতন্ত্রকে কবর দিয়ে সামরিক আইন জারি করেন তখন আপনি সমর্থন জানিয়ে বলেছিলেন “আই এ্যাম নট আন হ্যাপি”। প্রধানমন্ত্রী কিছুটা হলেও উপলব্ধি করেছেন যে, ১৫ আগষ্টের হত্যাকান্ডের সাথে আওয়ামী লীগের নেতারাও জড়িত ছিল। সুতরাং অন্যদের দিকে অভিযোগ করে কোন লাভ নেই, আপনার আশেপাশের লোকদের সম্পর্কেই সতর্ক থাকুন। যে গণতন্ত্রকে বন্দী করেছেন সেটিকে মুক্ত করুন, মানুষের নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দিন, ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দিন, আপনাদের অন্তরে অম্লান আবারো একদলীয় নির্বাচনের বাসনা পরিত্যাগ করুন, সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করুন। হিংসাপরায়ণ রাজনীতি পরিহার করুন, মিথ্যা, বানোয়াট, অসত্য, কদর্য ও কুৎসিত রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়া থেকে নিজেদের বিরত রাখুন। গণতন্ত্রের ধারা সচল থাকলে অশুভ শক্তি মাথাচাড়া দিতে পারেনা। বন্ধুরা, আইনের শাসনের অভাবে দেশে যে ভয়াবহ নিষ্ঠুরতা চলছে, যেভাবে প্রতিদিন হত্যা, গুম, অপহরণ, নারী ও শিশু নির্যাতনের যে বর্বরতা চলছে, যেভাবে এসব ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা প্রতিদিন গণমাধ্যমে প্রচার ও প্রকাশ হচ্ছে তাতে দেশে কোন সরকার আছে বলে মনে হয় না। প্রতিদিনই পত্রিকার পাতা উল্টালেই বিভিষিকাময় পৈশাচিক আস্ফালনের চিত্রে সবাইকে আঁতকে উঠতে হয়। গতকালও সিলেটে সাত মাসের যমজ শিশুদের খাবার আনতে গিয়ে ধর্ষণের পর বিভৎস কায়দায় খুন করা হয়েছে এক মা’কে। রাজধানীর বনানীতে আলোচিত দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আবারও সিলেটে এই নির্মম ঘটনা ঘটলো। গত চার মাসে দেশব্যাপী দেড় হাজার নারী-শিশু হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এটি বহির্বিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তিকে সিরিয়াস ড্যামেজ করেছে। কটুভাষী ও গণতন্ত্র বিদ্বেষী সরকার আছে বলেই দেশব্যাপী ভয়াবহ অনাচারে চরম সামাজিক অবক্ষয় ঘটে চলেছে। সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা, শরীয়তপুর জেলাধীন ভেদরগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ তারাবুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদ ধানের শীষের প্রার্থী নুর উদ্দিন দর্জি ধানের শীষের প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করছিলেন। কিন্তু নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ধানের শীষ মনোনীত চেয়ারম্যান নুর উদ্দিন দর্জি যাতে দায়িত্ব পালন করতে না পারে সেজন্য তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানী করছে। এধরণের ঘৃন্য ও ন্যাক্কারজনক ঘটনায় আমি তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং ধানের শীষ প্রতীকের নির্বাচিত চেয়ারম্যান নুর উদ্দিন দর্জির বিরুদ্ধে হয়রানী বন্ধ করার জোর দাবি জানাচ্ছি। ধন্যবাদ। সবাই ভাল থাকুন। আল্লাহ হাফেজ।