বিএনপি চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ৭২তম জন্মবার্ষিকী আজ


বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন ও ২০ দলীয় জোট প্রধান দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ৭২তম জন্মবার্ষিকী আজ। ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট প্রত্যুষে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে বাবা এস্কান্দার মজুমদার ও মা তৈয়বা মজুমদারের কোল আলোকিত করে জন্মগ্রহণ করেন আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। দেশনেত্রীর জন্মদিন উদযাপনে বিএনপি ও এর অঙ্গ এবং সহযোগী সংগঠন ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। দেশনেত্রীর সুস্থতা কামনায় রোজা পালন, কেক কাটা, আলোচনা সভা ও তাঁর সুস্থতা কামনায় কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার বাবা এস্কান্দার মজুমদারের আদিনিবাস ফেনী জেলায়। পরবর্তীতে তাঁরা দিনাজপুর শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তিনি ১৯৬০ সালে দিনাজপুর সরকারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং সুরেন্দ্রনাথ কলেজে লেখাপড়া করেন। ১৯৬০ সালেই কলেজপড়–য়া বেগম খালেদা জিয়ার সাথে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাডেট অফিসার জিয়াউর রহমানের বিবাহ হয়। ১৯৬৫ সালের ২০ নবেম্বর বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম পুত্র তারেক রহমানের জন্ম হয়। ১৯৭০ সালের ১২ আগস্ট বেগম খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় সন্তান আরাফাত রহমান কোকো জন্ম নেয়।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের ওপর নৃশংসভাবে ঝাঁপিয়ে পড়লে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট থেকে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে বিদ্রোহ ঘোষণা করে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের দীর্ঘ ৯ মাস বেগম খালেদা জিয়া দুই সন্তানসহ গৃহবন্দি ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার সংহতি ও বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তৎকালীন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান এক পর্যায়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। প্রেসিডেন্টের সহধর্মিণী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া এ সময় দেশ-বিদেশে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেন ও রাষ্ট্র পরিচালনার কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন। জিয়াউর রহমানের প্রিয় সহধর্মিণী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া স্বামীর মতোই ইসলামী ও অতি সাধারণ সংযমী জীবনযাপন পছন্দ করেন। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে শাহাদতবরণের পর এতিম দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে ক্যান্টনমেন্টের বাসাতেই সাধারণভাবে জীবন যাপন শুরু করেন। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকেই বিএনপির রাজনীতিতে আসেন বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৮২ সালের ৮ জানুয়ারি সংবাদপত্রে এক বিবৃতিতে তিনি বলেছিলেন, ‘প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি শোষণহীন, দুর্নীতিমুক্ত, আত্মনির্ভরশীল দেশ গঠনের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গঠন করেছিলেন। বিগত কিছুকাল যাবৎ আমি বিএনপির কার্যক্রম গভীরভাবে লক্ষ্য করেছি। দলের ঐক্য ও সংহতি বিপন্ন হতে পারে, এমন মনে করে আমাকে দলের দায়িত্ব নেয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। তাই দলের বৃহত্তর স্বার্থে বিএনপিতে যোগ দিয়েছি ও দলের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হয়েছি। দেশ ও জাতির স্বার্থে এবং শহীদ জিয়ার গড়া দলে ঐক্য ও সংহতির স্বার্থে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যাওয়া আমার লক্ষ্য। রাজপথের নেত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া ১৯৮৪ সালের আগস্ট মাসে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর তাঁর ওপর নানাবিধ হুমকি আসতে থাকে, চক্রান্ত চলতে থাকে তাঁকে ব্যর্থ করে দেয়ার। কিন্তু অকুতোভয়, সাহসী, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্রের পথে পথ চলতে আপসহীন ভূমিকা নিয়েছিলেন। জেনারেল এরশাদের জোরপূর্বক রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে ও গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলনে নামেন বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৮৬ সালের এরশাদের পাতানো নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়া ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ওয়াদা করেছিলেন, ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে কেউ যাবেন না। যারা যাবে তারা জতীয় বেঈমান হিসেবে চিহ্নিত হবে। সেই নির্বাচনে শেখ হাসিনা গিয়ে জাতির কাছে জাতীয় বেঈমান হন। আর সাধারণ নির্বাচনে না গিয়ে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্র-জনতা তাকে আপসহীন দেশনেত্রীর উপাধিতে ভূষিত করে। এরপর আরো ৫ বছর স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে বেগম খালেদা জিয়া অসহনীয় জুলুম-নির্যাতন সহ্য করে চূড়ান্ত ‘গণআন্দোলন’ সংগঠিত করেন।

১৯৯০ সালে তাঁর নেতৃত্বে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে সরকার পতনের একদফা আন্দোলনের ডাকে দেশের মানুষ রাজপথে নেমে আসে। ফলে এরশাদ ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়। বেগম খালেদা জিয়ার গণআন্দোলন সফল হয়। ফিরে আসে গণতন্ত্র। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের সরকারের অধীনে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন করলে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। জয়ী হয়ে দীর্ঘ ১৬ বছর পর তিনি দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র চালু করেন এবং প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এ সময় অভিন্ন নদীর পানি প্রাপ্তিতে আমাদের ন্যায্য পানির হিস্যা আদায়ে বেগম খালেদা জিয়া জাতিসংঘের অধিবেশনে বলিষ্ঠ কন্ঠে দাবি করেছিলেন পানির জন্য। দেশে বিরোধীদলের দাবির প্রেক্ষিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করতে গিয়ে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বেগম খালেদা জিয়া দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমেই দেশে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা চালু হয়। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন প্রশাসনিক কারচুপির নির্বাচনেও বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি ১১৬টি আসন পেয়ে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে গণতন্ত্র ও দেশের উন্নয়নে ছায়া সরকার হয়ে কাজ করেছেন।

২০০১ সালে জনগণের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন নির্বাচনে ভোট বিপ্লবের মাধ্যমে বিজয়ী হয়ে তৃতীয়বারের মতো রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার পান বিএনপি চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। এ সময় নির্বাচনের কৌশল নির্ধারণে পিতা-মাতার যোগ্য উত্তরসূরি বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও বিএনপির বর্তমান সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও অবদান রেখেছিলেন। এ সময় অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সন্ত্রাস দমন, শিক্ষা বিস্তারে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে বিএনপি সরকার। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের পথ ধরে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর আওয়ামী লীগের লগি-বৈঠার তান্ডবে প্রকাশ্যে রজপথে মানুষ হত্যা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির করে ১/১১’র পথ সৃষ্টি করে। দেশের সংবিধান ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ভেঙে সেনা সমর্থিত কথিত ১/১১’র সরকার ক্ষমতা দখল করে। এসময় রাজনৈতিক দল ও গণতন্ত্র নিশ্চিত ধসের মুখে দাঁড়ালেও সমস্ত ভয়কে জয় করতে গণতন্ত্রের ঝান্ডা হাতে দেশবাসীর পাশে ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর দুই পুত্র দীর্ঘদিন কুচক্রীর ষড়যন্ত্রে কারাগারে অসহনীয় নির্যাতনে ধুঁকেছেন। জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানের মেরুদন্ডের হাড় ভেঙে দেয়া হয়েছে, যেন তিনি পিতার মতো জনগণের ঘরে ঘরে যেতে না পারেন, হাঁটতে না পারেন। নির্যাতনে মালয়েশিয়ায় প্রবাসী জীবনে ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু হয় দেশনেত্রী নিজ অফিসে অবরুদ্ধ থাকাবস্থায়। শত চাপ ও নির্যাতনের মুখেও রাজনীতি ও দেশত্যাগ করেননি দেশনেত্রী।

১/১১’র সরকারের বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে দেশে একদলীয় বাকশাল কায়েমের জন্য যখন মরিয়া হয়ে খুন, গুম, ক্রসফায়ার, মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ নানাবিধ অপরাধ ও অপকর্মে লিপ্তকালীন বিগত সাড়ে ৫ বছর ধরেই দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছেন। কিন্তু দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীদের পৃষ্ঠপোষকতায় পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির হত্যা, গুম ও গণগ্রেফতারের মাধ্যমে দেশে এক ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি করে আওয়ামী লীগ ভোটারবিহীন একদলীয় ৫ জানুয়ারির কলঙ্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে। তখন দেশে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে বেগম খালেদা জিয়া আরেকবার লড়াইয়ের দৃপ্ত ঘোষণা দিয়েছেন। অতীতেও দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র ও অন্যায় দাবির মুখে কখনোই মাথানত না করার ঐতিহাসিক সত্যতা রয়েছে বেগম খালেদা জিয়ার। নিজের কর্তব্য থেকে একচুল সরে না আসা, দেশপ্রেম ও ভালোবাসাকে আঁকড়ে ধরে দেশের সাড়ে ১৬ কোটি মানুষকে সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র আর বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখার শক্তি যুগিয়েছেন তিনি। বর্তমান আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত স্বৈরাচারী সরকার একদলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে চিরস্থায়ী করার স্বপ্ন দেখছে। দেশি-বিদেশি চক্রান্তকে রুখে দিয়ে জাতীয়তাবাদী শক্তির উন্মেষ ঘটিয়ে কান্ডারী হয়ে বেগম খালেদা জিয়া জনগণকে এনে দেবেন আলোকিত দিনÑএ বিশ্বাস সকলের।

যুবদলের কর্মসূচি : বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে দেশব্যাপী দোয়া মাহফিল ও বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করবে জাতীয়তাবাদী যুবদল। বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন উপলক্ষে যুবদলের আয়োজনে আজ ১৫ আগস্ট দেশের সকল জেলা , মহানগর, থানা ও পৌর শাখায় যুবদল কর্তৃক দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া দেশের যে সমস্ত এলাকা বন্যায় প্লাবিত হয়েছে সে সব এলাকায় বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। যুবদলের সভাপতি সাইফুল আলম নীরব ও সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মসূচি : বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন উপলক্ষে দেশব্যাপী দোয়া মাহফিল দেশের সকল জেলা, মহানগর, থানা ও পৌর শাখায় যুবদল কর্তৃক দোয়া মাহফিলের আয়োজন করবে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল। বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে স্বেচ্ছাসেবক দল বন্যা প্লাবিত এলাকায় বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণও করবে দলটি। স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবু ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েল এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। 
-সূত্র : দিনকাল ; রফিক মৃধা