৭ নভেম্বরের মহানায়ক, নায়ক এবং খলনায়ক প্রসঙ্গ


আজ ৭ নভেম্বর। ১৯৭৫-এর ৭ নভেম্বর স্মরণে বিগত ২৭ বছর ধরে এই দিবসটিকে পালন করা হচ্ছে কম-বেশি আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে। জনপ্রিয় আমার দেশ পত্রিকার পাঠককূলের মধ্যে যাদের বয়স কম, তাদের মনের স্বাভাবিক প্রশ্ন হচ্ছে, ১৯৭৫-এর ৭ নভেম্বর এমন কী হয়েছিল যে এই দিবসটিকে স্মরণ করতে হবে। যুগপত্ আরও একটি প্রশ্ন মনে উঁকি দেয় এই মর্মে যে, বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্গনে জাতীয়তাবাদী শক্তি বলে যারা পরিচিত শুধু তারা কেন দিবসটি পালন করেন এবং ধর্ম নিরপেক্ষ চেতনার শক্তি বলে যারা পরিচিত তারা কেন এর বিরোধিতা করে? ১৯৭৫ সালের এই দিনটিতে জেনারেল জিয়াউর রহমানের ভূমিকা কী ছিল এই প্রসঙ্গেও পাঠকের মনে (বিশেষত তরুণ সমাজের মনে) কৌতূহলের অন্ত নেই। সর্বশেষ বাস্তবতা হলো, পত্রিকার কলামগুলো সীমিত আকারের হয় এবং যে কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সব আঙ্গিক ওই কলামে আলোচনা করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। কিন্তু সীমিত বক্তব্যে আগ্রহী পাঠকের মন ভরে না। ১৯৭৫-এর নভেম্বরের ওই দিনটির আমি একজন চাক্ষুস সাক্ষী এবং হাজার হাজার সৈনিকের সঙ্গে আমিও একজন অংশগ্রহণকারী। সেনাবাহিনীর চাকরি থেকে অবসরে আসার পর, ধর্মীয় মূল্যবোধের চেতনা যোগ জাতীয়তাবাদী চেতনা যোগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সম্মিলিত অনুভূতির একজন নাগরিক হিসেবে গবেষণা, চিন্তা-চেতনা ও লেখালেখিতে ব্যস্ত থেকেছি। ওই সুবাদে ১৯৭৫ সম্বন্ধেও জানতে চেষ্টা করেছি। ২০১১ সালের একুশের বইমেলায় ‘অনন্যা’ কর্তৃক প্রকাশিত ‘মিশ্র কথন’ নামক পুস্তকে আমি এ বিষয়ে অনেক দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক আলোচনা করেছি, যে আলোচনা আগ্রহী পাঠকের মনে জানার ক্ষুধা কিছুটা নিবারণ করতেও পারে। এই কলামে খুব সংক্ষেপে পাঁচটি কথা বলছি। প্রথম কথা : ১৯৭২ থেকে ১৯৭৩-এর আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ছিল একান্তভাবেই মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও সৈনিকের সমন্বয়ে গঠিত। অতঃপর পাকিস্তান থেকে অফিসার ও সৈনিকরা রিপেট্রিয়েইট বা প্রত্যাবাসিত হয়ে আসার পর দৃশ্যপট বদলাতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধাগণের মধ্যে এবং পাকিস্তান ফেরতগণের মধ্যে ভ্রাতৃত্বসুলভ বন্ধন গড়ে তোলার কাজটি খুব কঠিন ছিল। পাকিস্তানের বিভিন্ন দুর্গে আটক থাকাকালে বাঙালি অফিসার ও সৈনিকরা বাংলাদেশে ফেরতের পর যে দৃশ্যপট কল্পনা করতেন, বাস্তবে বাংলাদেশে ফেরত আসার পর তারা সেই দৃশ্যপটের সঙ্গে মিল খুঁজে পাননি। একাধিক কারণে সৈনিকদের মধ্যে একটি অংশ সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হতে থাকে। তারা একটি গোপন সৈনিক সংস্থা গঠন করেছিলেন; তাদের উদ্দেশ্য ছিল শুধু সেনা বিপ্লবের মাধ্যমে অথবা সেনা ও রাজনৈতিক বিপ্লবের মাধ্যমে দেশের সরকার পরিবর্তন করা। তারা নিজেরা সংঘটিত হলেও, গোপন কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের সন্ধানে তাদের অনেক সময় লেগেছে। দ্বিতীয় কথা : বঙ্গবন্ধু-সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদী রাজনৈতিক দল ছিল ১৯৭২-এর অক্টোবরে গঠিত জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)। তারা রাজপথে সরকারের বিরোধিতা করা শুরু করে। তাদের আন্দোলন গতি পেয়েছিল, জনজীবনে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করতে পেরেছিল কিন্তু রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। তখন জাসদও চিন্তা করেছিল যে, শুধু রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকারের মতো এতবড় প্রতিষ্ঠিত শক্তিকে অবস্থানচ্যুত করা সম্ভব হবে না; অতএব সেনাবাহিনীর কোনো অংশকে যদি বন্ধু হিসেবে পাওয়া যায় তাহলে ভালো। এই মোতাবেক তারা, অর্থাত্ জাসদ, সেনাবাহিনীর মধ্যে বন্ধু খোঁজার কাজে লিপ্ত হয়। বিবিধ প্রক্রিয়ায় এবং ঘটনার মাধ্যমে জাসদের সঙ্গে গোপন সৈনিক সংস্থার পরিচয় বন্ধুত্ব এবং সংহতি সৃষ্টি হয়। সেই সময় জাসদের অন্যতম নেতা ছিলেন জনাব আ.স.ম. আবদুর রব, মুক্তিযুদ্ধকালীন অন্যতম সেক্টর কমান্ডার মেজর এমএ জলিল এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন অন্যতম সেক্টর কমান্ডার যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তম, জনাব হাসানুল হক ইনু প্রমুখ। ১৯৭৪ এবং ১৯৭৫ এই রাজনৈতিক শক্তি (জাসদ) এবং সৈনিক শক্তি (গোপন সৈনিক সংস্থা)-এর সমন্বয়ে প্রস্তুতি চলে রাজনৈতিক-সৈনিক বিপ্লবের উদ্দেশ্যে। ১৯৭৫-এর আগস্টের ১৫ তারিখের ঘটনা তাদের হিসাবের মধ্যে ছিল না। ১৯৭৫-এর নভেম্বরের ৩ তারিখের ঘটনাও তাদের হিসাবের মধ্যে ছিল না। অতএব, এই যুগ্ম শক্তি দ্রুতগতিতে সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা যদি নিষ্ক্রিয় বসে থাকে তাহলে আবারও কোনো কিছু এমন ঘটে যেতে পারে যেটা তাদের লক্ষ্য অর্জনকে বিঘ্নিত করবে। অতএব, তারা সিদ্ধান্ত নেয় বিপ্লব সাধনের। তাদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক দিন ও ক্ষণ ছিল ৬ নভেম্বর দিবাগত রাত ১২টা তথা ৭ নভেম্বরের প্রথম মুহূর্ত। তৃতীয় কথা : বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার প্রেক্ষাপটে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক হোঁচট খায়। কারণ, খোন্দকার মোশতাক আহমেদ ভারতপন্থী ছিলেন না। সুতরাং ভারতের অনুকূলে সম্পর্ককে পুনঃস্থাপন করা জরুরি ছিল। এই পরিপ্রেক্ষিতে, তত্কালীন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অনেকেই এবং তত্কালীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের অনেকেই, ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ তারিখে অনুষ্ঠিত ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানটিকে ভারতপন্থী অভ্যুত্থান হিসেবে মূল্যায়িত করে। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানের নেতারা বলেছিলেন যে, খোন্দকার মোশতাকের সরকারকে উত্খাত করা প্রয়োজন এবং বঙ্গভবনে বসে বসে পরোক্ষভাবে দেশ চালাচ্ছিলেন যেসব ১৫ আগস্টের বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তা, তাদের উত্খাত করা প্রয়োজন; অতএব অভ্যুত্থান প্রয়োজন। যেহেতু তত্কালীন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান এই উত্খাত করার প্রক্রিয়ায়, খালেদ মোশাররফপন্থীদের মতে ও তাদের চাহিদা মোতাবেক নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন না, তাই ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানকারীরা জেনারেল জিয়াউর রহমানকে বন্দি করেছিলেন। এই বন্দি করার ঘটনাটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অতি বৃহদাংশের সাধারণ সৈনিকদের কাছে অগ্রহণযোগ্য ছিল এবং এর কারণে তারা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। সাধারণ সৈনিকরা বিক্ষুব্ধ চিত্তে অপেক্ষা করছিলেন, কী নিয়মে আসলে ভারতপন্থী হোক বা না হোক কিন্তু তাত্ক্ষণিক মূল্যায়নে ভারতপন্থী মনে হওয়া খালেদ মোশাররফ বীর উত্তম-এর নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহকে নস্যাত্ করা যায় এবং জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করা যায়। কিন্তু জাসদপন্থী গোপন সৈনিক সংস্থার সদস্যদের মতো, সাধারণ সৈনিকরা আনুষ্ঠানিকভাবে সংগঠিত ছিলেন না। এই কারণে ৭ নভেম্বর প্রথম মুহূর্ত থেকেই সব সৈনিককে সাধারণভাবে একটি পাল্লায় বা একই মাপকাঠি দ্বারা মূল্যায়ন করা অসম্ভব ও অবাস্তব। চতুর্থ কথা : জাসদ ও গোপন সৈনিক সংস্থার সিদ্ধান্ত ছিল ৭ নভেম্বরের প্রথম মুহূর্তে বিপ্লব শুরু করবে সাধারণভাবে ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে অবস্থিত কোনো না কোনো স্থাপনার ওপর আক্রমণ করে। দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত ছিল, যেখানে যেখানে সম্ভব সেখানে সেখানে অফিসারদের হত্যা করা। কারণ, অফিসাররা ব্যতিক্রমী কোনো বিপ্লবের পক্ষে নয়। জাসদ এবং গোপন সৈনিক সংস্থার এই সিদ্ধান্তগুলোকে বাস্তবায়নের জন্য সেনানিবাসের অভ্যন্তরে বসবাসরত সৈনিক ও অন্যদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করা প্রয়োজন ছিল। সেই জন্য ৬ তারিখ সারাদিন বিভিন্ন মাধ্যমে ও ছত্রছায়ায় সেনানিবাসের অভ্যন্তরে লিফলেট বিতরণ করা হয়। কিছু কিছু লিফলেটের শিরোনাম ছিল এই রকম : সিপাহী সিপাহী ভাই ভাই, অফিসারের রক্ত চাই। এরূপ লিফলেট সম্বন্ধে ও প্রচারণা সম্বন্ধে আমি ৬ তারিখ সন্ধ্যাবেলায় মাত্র অবগত হই। ৬ নভেম্বর বাদ মাগরিব সমাগত রাত্রিকালের সম্ভাব্য বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড সম্বন্ধে ধারণা পাই। একা কোনো কিছু করার ছিল না। শুভাকাঙ্ক্ষী অন্যান্য অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাই। অতএব আমি নিজে নিজেই সিদ্ধান্ত নিলাম যে, সঙ্কট মুহূর্তে আমি আমারই পেরেন্ট-ব্যাটালিয়ন অর্থাত্ দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট-এ গিয়ে অবস্থান নেয়া উচিত। কারণ, বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসারদের একটি স্বাভাবিক প্রত্যয় থাকত এই মর্মে যে, সৈনিকরা ও অফিসাররা একাত্ম। অতএব কোনো বিশৃঙ্খলা হবে না। মধ্যরাত বারোটায় আমি আমার আবাসস্থল ত্যাগ করে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উদ্দেশ্যে রওনা দিই। মধ্যরাত বারোটা থেকে ঢাকা সেনানিবাসের আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হচ্ছিল গুলির আওয়াজে এবং আকাশে গেলে প্রজ্বলিত হয় এমন গুলির আলোতে যেগুলোকে সামরিক পরিভাষায় বলা হয় ট্রেইসার-বুলেট। এরূপ গোলযোগের মধ্য দিয়ে ব্যাটালিয়নে উপস্থিত হই। তত্কালীন মেজর কামরুল এবং ক্যাপ্টেন এনামকে ব্যাটালিয়নে পাই। ব্যাটালিয়নের সুবেদার মেজর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মান্নান, মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার নুরুল আনোয়ার প্রমুখ অন্যদের নিয়ে আমার পরামর্শ মোতাবেক চলতে তাত্ক্ষণিকভাবে সম্মত হয়। সারারাত ঘাত-প্রতিঘাতের মাধ্যমে কাটাই। সকাল পাঁচটায় আমার হুকুমে এবং অনুমতিতে, সবার সম্মিলিত পরিকল্পনায়, দ্বিতীয় বেঙ্গলের সৈনিকরা নিজেদের গাড়ি-ঘোড়াতে করেই সব অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বিপ্লবে যোগ দেয়। পঞ্চম কথা : বৃহত্তর দৃশ্যপটের বর্ণনা। আনুমানিক মধ্যরাত একটার দিকে সাধারণ সৈনিকরা এবং গোপন সৈনিক সংস্থার সদস্য সৈনিকরা জেনারেল জিয়াউর রহমানের বাড়ি ঘেরাও করে। তাদের সম্মিলিত উদ্দেশ্য জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করা। গত চারদিন ধরে যেসব সৈনিক জেনারেল জিয়াউর রহমানের বাড়িতে পাহারা দিচ্ছিলেন তারা কোনো শক্ত প্রতিরোধ উপস্থাপন করেননি। বলে রাখা ভালো যে, ওই আমলের সেনাবাহিনীতে জেনারেল জিয়াউর রহমান একজন সত্, শৃঙ্খলাপন্থী নেতা হিসেবে সৈনিকদের কাছে শ্রদ্ধাভাজন ও জনপ্রিয় ছিলেন। বিপ্লব শুরুর কাল থেকেই ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই জেনারেল জিয়াউর রহমান বাস্তবে মুক্ত হয়ে যান। অতঃপর দৃশ্যপট বদলে যায়। জাসদপন্থী সৈনিকরা চাচ্ছিলেন জেনারেল জিয়াউর রহমান তাদের নিয়ন্ত্রণে থাক এবং তাঁকে ব্যবহার করে সমাজতান্ত্রিক সেনাবাহিনী কায়েম ও সমাজতান্ত্রিক সরকার পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। অপরপক্ষে সাধারণ সৈনিকরা চাচ্ছিলেন জেনারেল জিয়াউর রহমান তাদের নিয়ন্ত্রণে থাক এবং সেনাবাহিনী ও দেশের নেতৃত্ব প্রদান করতে থাকুন। জেনারেল জিয়াউর রহমান অন্য শুভাকাঙ্ক্ষী জ্যেষ্ঠ অফিসারদের পরামর্শে এবং সৈনিকদের আগ্রহে, ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থিত দ্বিতীয় ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি (সংক্ষেপে সেকেন্ড ফিল্ড নামে পরিচিত)-এর অবস্থানে গিয়ে নিজের জন্য একটি অতি সাময়িক কমান্ড হেড কোয়ার্টার সৃষ্টি করেন। ৬ নভেম্বর দিবাগত রাতের শেষাংশ তথা ৭ নভেম্বর সূর্য উদয়ের এক-দুই ঘণ্টা আগের ঘটনা অনেক প্রকার রহস্যের আড়ালে এখনও আবৃত। যেটা সুনিশ্চিত সেটা হলো জিয়াউর রহমানের প্রতি অনুগামী সৈনিকরা, গোপন সৈনিক সংস্থার সৈনিকদের পরাভূত করেন এবং সেনানিবাসে ও ঢাকা মহানগরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। সাধারণ সৈনিকরা বঙ্গভবনের চতুর্পাশে কৌশলগত অবস্থান গ্রহণ করত: এবং প্রকাশ্য চাপ প্রয়োগ করত: বঙ্গভবনের ভেতরে অবস্থানকারী সবাইকে পরাভূত করেন। এরূপ পরাভূত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে, ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ বীর উত্তম এবং তাঁর অনুসারীরা গোপনে বঙ্গভবন ত্যাগ করেন। সেই সময়টি আনুমানিক ফজরের নামাজের সময় ছিল। ঐ অফিসারগণের মধ্যে তিনজন একযোগে, নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ঢাকা থেকে মিরপুরগামী সড়ক অনুসরণ করেন। গোপনে খবর পান যে, মিরপুর ব্রিজের কাছে বাধা আছে, তাই তারা এক পর্যায়ে শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত দশম বেঙ্গল রেজিমেন্টে গিয়ে আশ্রয় নেন। বলে রাখা ভালো দশম বেঙ্গল রেজিমেন্ট রংপুর সেনানিবাস থেকে মাত্র একদিন আগে ঢাকা মহানগরীতে এসে পৌঁছিয়েছিল। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফ হুকুম দিয়েছিলেন দশ ইস্ট বেঙ্গলকে ঢাকা আসতে যেন ঢাকায় তার অনুগামী সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি পায়। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যেই তিনটি নতুন ব্যাটালিয়ন যুদ্ধকালেই জন্ম হয়েছিল তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দশম ইস্ট বেঙ্গল। এই ব্যাটালিয়নটি মুক্তিযুদ্ধকালীন ‘কে’ ফোর্স কমান্ডার কর্নেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে যুদ্ধ করে। অতএব, খালেদ মোশাররফ বীর উত্তম-এর আহ্বানে তারা সাড়া দিয়ে ঢাকায় এসেছিল। যখন কর্নেল খালেদ মোশাররফ, রংপুরের তত্কালীন ব্রিগেড কমান্ডার কর্নেল খোন্দকার নাজমুল হুদা এবং অষ্টম বেঙ্গলের অধিনায়ক লে. কর্নেল এটিএম হায়দার দশম বেঙ্গলে আশ্রয় চান, তখন তারা সেই আশ্রয় লাভ করেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে এক রহস্যাবৃত পরিস্থিতিতে তিনজনই নিহত হন। তাদের লাশ বহনকারী গাড়ি যখন দ্বিতীয় ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারিতে আসে, তখন শত শত সৈনিকের সঙ্গে আমিও দেখি। এই নিয়মেই ৩ নভেম্বরের সেনা অভ্যুত্থান ব্যর্থতায় পর্যবেসিত হয়। ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানটি ভারতপন্থী ছিল কি ছিল না সেটা নিয়ে মিশ্র অনুভূতি আছে। কিন্তু বেশিরভাগ অফিসার ও সৈনিকের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল যে, এটি ভারতপন্থী অভ্যুত্থান ছিল তথা ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট হারিয়ে যাওয়া বাকশালকে (বা অন্ততপক্ষে আওয়ামী লীগকে) পুনরায় ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার একটি প্রচেষ্টা ছিল এই অভ্যুত্থান। ঢাকা মহানগরের লাখ লাখ জনগণও এটাই মনে করেছিলেন। উপসংহার : ৭ নভেম্বর সূর্য উদয়ের পরপরই জেনারেল জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা শুরু করেন। অতি দ্রুত নিজের অনুগামী সৈনিকদের ওপরেও শৃঙ্খলা বলবত্ করেন। ঢাকা মহানগরের জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সারাদিন সৈনিকদের সঙ্গে মিলেমিশে মিছিল ও সমাবেশ করেন। মিছিল ও সমাবেশের অন্যতম দাবি ছিল দেশ বাঁচাও, সেনাবাহিনী বাঁচাও, ভারতপন্থীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও। ৭ নভেম্বরে অনেক অফিসার নিহত হয়েছিলেন এটা সত্য। রাতের বেলা অফিসাররা নিহত হয়েছেন জাসদপন্থী সৈনিকদের হাতে। দিনেরবেলা অফিসাররা নিহত হয়েছেন ভারত বিরোধী সৈনিকদের হাতে। চূড়ান্ত পর্যায়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষাকারী হিসেবে আবির্ভূত হন জনগণের ও সৈনিকগণের সম্মিলিত নেতা জেনারেল জিয়াউর রহমান। ৭ নভেম্বর এবং জেনারেল জিয়াউর রহমান অবিচ্ছেদ্য। এক প্রকারে বলতে গেলে ৭ নভেম্বর স্বাধীনতা রক্ষার পুন:নিশ্চিতকরণ দিবস এবং এর মহানায়ক জেনারেল জিয়াউর রহমান। তাই ৭ নভেম্বরকে বিপ্লব ও সংহতি দিবস বলা হয়। লেখক : মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক, চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি