ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর : ইতিহাসের ধারা নির্ধারণের দিন


পুরনো ব্যবস্থাকে দুমড়ে-মুচড়ে পুরোপুরি অকেজো করে ছুড়ে ফেলে নতুনভাবে রাজনৈতিক সমাজ গড়ার উদ্যোগই হলো বিপ্লব। রাজনৈতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এবং সমাজ চেতনার দিক পরিবর্তনই এর লক্ষ্য। বিপ্লবের পর তাই সামাজিক ইতিহাসের গতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। স্কসপোলের কথায় ‘তা (বিপ্লব) সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নতুন বিন্যাসের সূচনা করে’ [It (revolution) inaugurates new order both in the society and Ploity'- Skocpol, 1975:175]। এ প্রেক্ষাপটে ৭ নভেম্বরের বিপ্লব ও সংহতি দিবসের পর্যালোচনা করুন। দেখবেন সব বিতর্কের অবসান ঘটেছে। ৭ নভেম্বরের ঘটনাক্রম যে বিপ্লবাত্মক তার প্রমাণ মেলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এমনকি সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের দিকে দৃষ্টি দিলে। ৭ নভেম্বরের পরের বাংলাদেশ ৭ নভেম্বরের আগের বাংলাদেশ থেকে স্বতন্ত্র হয়ে ওঠে। এ স্বাতন্ত্র্য সুন্দর হয় অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে। সুন্দর হয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও। ৭ নভেম্বরের আগের বাংলাদেশে বিদ্যমান অগণতান্ত্রিক একদলীয় বাকশালের ঘন কুয়াশা ৭ নভেম্বরের পরের বাংলাদেশে কেটে গেছে। বহদলীয় গণতন্ত্রের অনুসারী দলগুলো ক্রমেই বিকশিত হতে শুরু করেছে। সংবাদপত্রের মুখে নতুনভাবে কথা ফুটেছে। আগের বন্ধ চোখে দৃষ্টি ফিরেছে। কান খাড়া হয়েছে। নির্বাহী কর্তৃত্বের নিয়ন্ত্রণ থেকে সরে ক্রমেই বিচার বিভাগ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। ৭ নভেম্বরের বৈপ্লবিক ঘটনাক্রমের ফলে জেনারেল জিয়াউর রহমান শাসন পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। যদিও ৩ নভেম্বর তাকে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ পদত্যাগে বাধ্য করে গৃহবন্দি করেছিলেন। বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান, কৃতী মুক্তিযোদ্ধা এবং একাত্তরের অনিশ্চিত মুহূর্তে স্বাধীনতার ঘোষণা দানকারী জিয়াউর রহমান সিপাহী-জনতার সম্মিলিত উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন হলেন, কোনো পূর্ব পরিকল্পনার মাধ্যমে নয়, নয় কোনো ষড়যন্ত্র অথবা কোনো সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। তিনি ক্ষমতা কেন্দ্রে অভ্যুত্থান এবং প্রতি অভ্যুত্থানের ফলে সৃষ্ট ক্ষমতার শূন্যতা পূরণ করতে এগিয়ে এলেন ৭ নভেম্বরের বিপ্লবের মাধ্যমে, অনেকটা জেনারেল দ্য গল(De Gaulle, Charles) বিপর্যস্ত ফ্রান্সের রাজনৈতিক মর্যাদা সংরক্ষণের জন্য যেমন আবির্ভূত হয়েছিলেন ফরাসি ইতিহাসের এক সংকটময় মুহূর্ত, ঠিক তেমনি। ৭ নভেম্বরের পর থেকেই রুশ-ভারতের অন্ধকার কক্ষপথ থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মুক্তিলাভ করে বিশ্বময় বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ লাভ করে। দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এবং পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় সমসার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে বাংলাদেশ এক গৌরবময় ভূমিকা পালনের জন্য সচকিত হয়ে ওঠে। দূরপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার নতুন নতুন ক্ষেত্র রচিত হতে থাকে। ৭ নভেম্বরের আগে যে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ছিল নিঃসঙ্গ, বন্ধুবিহীন, একাকী সেই বাংলাদেশ বিশ্বময় বহুসংখ্যক সুহৃদ ও শুভানুধ্যায়ীর গতিশীল হতে থাকে। ৭ নভেম্বরের পর আঞ্চলিক পর্যায়ে বাংলাদেশ মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশে ভারতবিরোধী মন-মানসিকতা পরিবর্তিত হয়ে সমসার্বভৌমত্বের এবং সা¤্রাজ্যের ভিত্তিতে সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে, যার পরিপূর্ণ রূপ আরো পরে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা গঠনে সহায়ক হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ নতুনভাবে উজ্জীবিত হয়। সমাজতন্ত্রের নামে দেশে যে অপচয়প্রবণ দুর্নীতিগ্রস্ত অর্থনৈতিক কাঠামো বিদ্যমান ছিল তার অবসান ঘটতে থাকে। ব্যক্তি উদ্যোগ এবং সৃজনশীল প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হয়। হেনরি কিসিঞ্জারের সেই নির্মম অভিধা- ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র শতছিদ্র একে একে বন্দ হতে থাকে। সংকীর্ণ বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে সামাজিক পর্যায়ে বৃহৎ পরিধিবিশিষ্ট উদার এবং রাষ্ট্রকেন্দ্রিক পরিশীলিত বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আবেদন ব্যাপকভিত্তিক হয়ে ওঠে। মোটকথা, ৭ নভেম্বরের পর বাংলাদেশের বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির(World view) মৌলিক পরিবর্তন ঘটে। ৭ নভেম্বরের বিপ্লব ও সংহতি দিবসের তাৎপর্যের আর একটি দিক হলো সৈনিক ও জনতার মধ্যে এত দিন পর্যন্ত যে অনতিক্রম্য দূরত্ব বিদ্যমান ছিল এ আন্দোলনে তার অবসান হলো। জাতীয় স্বার্থে যা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়, সেক্ষেত্রে সিপাহী এবং জনতার উচ্চকণ্ঠে সমগ্র সমাজকে সচকিত করে তোলে। জাতীয় চেতনা এবং জাতীয় স্বার্থের সুষম বন্ধনে আবদ্ধ হয় জনগণ ও বিভিন্ন পেশার কর্মকর্তারা। এদিক থেকেও বলা যায়, প্রতিরক্ষা এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার সার্বিক পুনর্গঠনে সৃজনশীল নেতৃত্বের সুর ঝংকৃত হয়ে ওঠে এই বিপ্লবে এবং সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো বাংলাদেশের নতুন রাজনীতির সুর ও ছন্দ জিয়ার কণ্ঠে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। বাংলাদেশের নতুন রাজনীতির প্রকৃতি তার কর্মকা-ে মূর্ত হয়ে ওঠে। জাতীয় জীবনের সেই সন্দিক্ষণে যখন সামরিক অভ্যুত্থান এবং প্রতি অভ্যুত্থানের আঘাতে জাতীয় ঐক্য ছিন্ন হয়ে পড়ে, জাতীয় নিরাপত্তা পর্যন্ত বিপন্ন হয়ে ওঠে, সামরিক বাহিনীর মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠানটি যখন উচ্চাভিলাষী সামরিক কর্মকর্তাদের ব্যক্তিস্বার্থের মাধ্যম হয়ে পড়ে তখনই জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনে বিপ্লব সংঘটিত হয় ৭ নভেম্বর এবং এই বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাসের ধারা নির্ধারিত হয়ে গেল। এসব কারণেই এ দিবসটির গুরুত্ব এই জাতির ইতিহাসে এমন তাৎপর্যপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে এটিও উল্লেখযোগ্য, বাংলাদেশের জনগণের তখনকার চিন্তা-ভাবনা আজকের চিন্তা-ভাবনা থেকেও তেমন ভিন্ন নয়। জাতীয় স্বাধীনতা বিপন্ন হলে অথবা বিপন্ন হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখা দিলে ৭ নভেম্বরের বিপ্লব ও সংহতি দিবসের প্রেরণা চিরঞ্জীব প্রত্যয়রূপে জাতিকে যে সঞ্জীবিত করবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যারা জনকল্যাণের লক্ষ্যে সমাজ পরিবর্তনে উদ্যোগী, জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রেখে দেশের সমস্যা সমাধানে আগ্রহী তাদের জন্যও ৭ নভেম্বরের শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লেখক : এমাজউদ্দীন আহমদ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।