১৭ এপ্রিল ২০২৪
প্রেস ব্রিফিং
সুপ্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,
আসসালামু আলাইকুম। আপনাদের সবাইকে জানাচ্ছি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা।
এক সময়ের জনপ্রিয় ছাত্রনেতা, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক, সিলেট জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি, সাবেক সংসদ সদস্য স্বৈরাচার বিরোধী সাহসী কন্ঠস্বর এম ইলিয়াস আলীর গুমের আজ ১২ বৎসর পূর্ণ হলো। তাকে ফিরে পাওয়ার অধীর অপেক্ষায় আজও প্রহর গুনছেন তার স্ত্রী—সন্তান—পরিবারসহ দেশের অগণিত নেতাকর্মী। শেখ হাসিনা সরকারের নির্দেশে ২০১২ সালের ১৭ই এপ্রিল মধ্যরাতে রাজধানী বনানীর ২ নম্বর সড়কের সাউথ পয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে থেকে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা গাড়িচালক আনসার আলীসহ তুলে নিয়ে যায় ইলিয়াস আলীকে। এরপর গাড়িটি পাওয়া গেলেও হদিস মিলেনি তাদের। একথা আজ জনগণের সামনে ষ্পষ্ট যে, এই ফ্যাসিবাদী সরকারই ইলিয়াস আলীকে গুম করেছে। কর্তৃত্ববাদী শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রাম আর টিপাইমুখ বাঁধ ও সীমান্ত আগ্রাসনের প্রতিবাদে সিলেট অঞ্চলে গড়ে উঠা গণ—আন্দোলনে নেতৃত্বের কারণে ইলিয়াস আলী রাষ্ট্রযন্ত্র ও দেশি—বিদেশি অপশক্তির গাত্রদাহের প্রধান কারণ ছিল। ইলিয়াস আলী আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ইলিয়াস আলীর জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক দক্ষতায় ঈর্ষান্বিত সরকার রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়ে তাকে গুম করে রেখেছে। ইলিয়াস আলীকে গুম করার পর সরকার বহুবিধ নাটক সাজিয়েছে। ওই সময় তার বিরুদ্ধে অশোভন কথা লিখে দেয়ালে পোস্টার সাঁটিয়েছিল সরকারের এজেন্টরা। গুমের ঘটনার পর তার স্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে খুদে বার্তা পাঠিয়ে শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাতের আয়োজন এবং ইলিয়াস আলীকে খুঁজে বের করার আশ্বাস ছিল লোক দেখানো। কারণ ওই সময় বিএনপির পাঁচ দিন হরতাল ছিল। আর বিএনপির সে হরতাল ও আন্দোলনকে বন্ধ করার জন্যই ছিল—ওই মিথ্যা আশ্বাস। গুম হওয়ার পরে থানায় জিডি করা হয়, কোর্টে মামলা করা হয়। এরপরও তাকে ফিরিয়ে দেননি শেখ হাসিনা। ইলিয়াস আলীর সন্ধানে দেশের বিভিন্ন স্থানে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে অভিযান চালানোর হাস্যকর নাটক করতে দেখা যায়। উচ্চ আদালতে করা ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসীনা রুশদীর লুনার রিট আবেদনের শুনানিও আটকে দেয় সরকার। অর্থাৎ অদৃশ্য হওয়া নাগরিককে ফেরত দেয়ার উচ্চ আদালতের নির্দেশনাকে বাধাগ্রস্ত করে সরকার। সুতরাং ইলিয়াস আলীসহ সকল গুম রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় হয়েছে। বেআইনী গুম—খুনের ফেষ্টিভ্যাল পালন করে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা।
বন্ধুরা/
সমাজে মানুষের মধ্যে ভয়, আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার বোধ সৃষ্টির জন্যই গুমকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে আওয়ামী নাৎসীবাদী শাসকগোষ্ঠি। মূল লক্ষ্য বিরোধী কণ্ঠকে নির্মূল করা, দীর্ঘ মেয়াদী ফ্যাসিবাদী শাসনকে নিস্কন্টক করা। এই সরকারের গোটা আমলটাই অপহরণ—গুম—খুন—ক্রসফায়ার এবং বন্দুকযুদ্ধের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কোন আর্তনাদ, হাহাহার তাদের বোধোদয় ঘটাতে পারেনি। শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে আজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দেশ, গুম—খুনের দেশ হিসাবে পরিচয় দান করেছেন। মহাদুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় সম্পদের হরিলুট, জনগণের টাকা আত্মসাৎ করে ক্ষমতাঘনিষ্ঠ লোকজনদেরকে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বানানোর সুযোগ দেয়া হয়েছে। গত দেড় দশক ধরে দেশের সম্পদের বিরাট অংশ তারা দুবাই, কুয়ালালামপুর, ইউরোপে পাচার করেছে। এই সমস্ত অনাচার জনচক্ষু থেকে সরিয়ে দিতে গুমের মতো নির্দয়—অমানবিক পন্থা অবলম্বন করেছে সরকার। ইলিয়াস আলীকে গুম করার ঘটনা কাকতালীয় বিষয় বা তাকে গুম করা শুধু সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল বলে আমরা মনে করি না। আমাদের বুঝতে হবে কী কারণে তিনি গুম হলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষার পক্ষে টিপাইমুখ বাঁধের বিরুদ্ধে তার সোচ্চার অবস্থানের কারণে ইলিয়াস আলী আজ অদৃশ্য। যারা অগণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার তাদেরই অত্যন্ত সচেতনভাবে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, গুম করা হচ্ছে, আয়নাঘরে আটক করে রাখা হচ্ছে। ভারতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তার প্রমাণ অভিনব গুমের শিকার হয়েছেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। তাকে দুই মাস গুম করে রাখার পর পাচার করা হয়েছে ভারতে। সেখানে তারা তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় ফেলে দেয়। দ্য এশিয়ান হিউমান রাইটস কমিশনের তথ্য অনুযায়ী ২০০৯ সালের জানুয়ারী থেকে, ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে গুম হয়েছেন ৬২৩ জন। বাংলাদেশের মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ এর সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২০২৩ সালের জানুয়ারী থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে দেশে নিখেঁাজ বা গুম হয়েছেন ১৬ জন। এই সময়ের মধ্যে বিচার বর্হিভূত হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন ৮ জন। এর মধ্যে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্রসফায়ারে মারা গেছে তিন জন। এপর্যন্ত গুম হয়েছে ৬৫০ জনের বেশী। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে গত ১৫ বছরে ৬ শতাধিক মানুষ গুম হয়েছেন। এরমধ্যে একটা অংশ যাদের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। দেশী ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এবং জাতিসংঘ তাদের বিভিন্ন সেশনে অনবরত বাংলাদেশে গুমের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করলেও শেখ হাসিনার গুম সরকার এটা নিয়ে তাচ্ছিল্য করে আসছে। এ রকম অসংখ্য পরিসংখ্যান আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছে রয়েছে।
সাংবাদিক বন্ধুরা/
গুম—খুন—ক্রসফায়ার বাহিনী র্যাব—এর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে গুমের মাত্রা কিছুটা কমলেও এখনো গুম হচ্ছে, তবে গুমের প্যাটার্ন চেঞ্জ হচ্ছে। সেটা হলো আগে যারা গুম হতো তারা আর ফেরত আসতো না। তবে এখন যারা গুম হচ্ছেন তারা ৫ দিন ৭ দিন এমনকি এক মাস পরেও কেউ কেউ ফেরত আসছে। অথবা লাশ পাওয়া যাচ্ছে। গুম বাহিনী এখন স্বল্প সময়ের জন্য গুম করছেন। এই স্বল্প সময়ের গুম হওয়াটাও খুবই ভয়ংকর। গুম হচ্ছে একদলীয় ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের নমুনা এবং চরমতম মানবতাবিরোধী অপরাধ। বাংলাদেশে বর্তমান শাসকগোষ্ঠি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে বিরোধী দল ও মত শূণ্য একদলীয় কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্যই গুমকে পথের কাঁটা দূর করার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে একের পর এক মানবতা বিরোধী অপরাধ করে যাচ্ছে। এই নৃশংস গুমের শিকার কেবল সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আলীই নন, সাইফুল ইসলাম হিরু, সাবেক কাউন্সিলর চৌধুরী আলম, জাহিদুল করিম তানভীর, মো. মাজহারুল ইসলাম রাসেল, আল আমিন, সাজেদুল ইসলাম সুমন, মোহাম্মদ আবদুল কাদের ভূঁইয়া মাসুম, জাকির হোসেন, মুন্না, মীর আহমদ বিন কাশেম, আবদুল্লাহিল আযমী, ইফতেখার আহমেদ দিনার, সোহেল রানা, মাহফুজুর রহমান সোহেল, জুনায়েদ আহমেদ, আনসার আলী, আল মোকাদ্দাস হোসেন, মোহাম্মদ ওয়ালিউল্লাহ, কে এম শামীম আখতার, হুমায়ুন কবির পারভেজসহ অসংখ্য বিরোধী নেতাকর্মীকে গুম করা হয়েছে। এইসব ঘটনা দেশবাসীকে অজানা আতঙ্কে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। সরকার কোনভাবেই ইলিয়াস আলীর গুমের দায় এড়াতে পারে না। একজন রাজনীতিবিদকে গুম করার মাধ্যমে তার আদর্শকে শেষ করা যায়না। রাজনীতিকে রাজনীতি দিয়েই মোকাবেলা করা উচিত। প্রত্যেকটি গুমের পেছনে আওয়ামী লীগ সরকার দায়ী। বিভিন্ন সময় তাদের মুখ থেকেই এ কথা বেরিয়ে আসছে। তাদের কেউ কেউ স্বীকারও করেছেন। গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যা মানবতার সবচেয়ে ভয়াবহতম অপরাধ। আমি বিএনপির পক্ষ থেকে সরকারের কাছে জোর দাবী জানাচ্ছি, প্রিয় নেতা এম ইলিয়াস আলীসহ সরকারের গুমের শিকার নেতা—কর্মীসহ সবাইকে অক্ষত অবস্থায় যার যার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিন। অন্যথায় একদিন প্রতিটি গুম—খুনের দায়ে বিচারের জন্য তৈরী হন।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ/
বাংলাদেশে ভয়ের সংস্কৃতি চালু করেছে ভোট ডাকাত মাফিয়া সরকার। কথা বলতে ভয় পাচ্ছে অনেকেই। গুম, খুন, অপহরণ আতঙ্কে দেশের গণতন্ত্রকামী প্রতিটি নাগরিক। স্বীকার করতেই হবে, শেখ হাসিনার অনেক গুন, দুর্নীতি—মিথ্যাচার, বাচালতা, টাকা পাচার, গুম, অপহরণ আর মানুষ খুন। এই গুনের কারণেই বিনাভোটের প্রধানমন্ত্রী হাসিনা বছরের পর বছর ধরে বন্দুকের জোরে রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে সমর্থ হচ্ছেন। তাঁর র্যাব—পুলিশ অনেক ক্ষেত্রেই কন্ট্রাক্ট কিলিং চালিয়েছে।
গণমাধ্যমে দেখেছি, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাহেব বিএনপির কাছে তালিকা চেয়ে তারস্বরে চিৎকার করছেন। ওবায়দুল কাদের সাহেব কিসের তালিকা চাইছেন ? এর আগেও তো তালিকা দেয়া হয়েছিল। আর তালিকা তো আপনাদের কাছেই রয়েছে। আইন—আদালত—থানা—পুলিশ তো আপনাদের কব্জায়। ওবায়দুল কাদের সাহেবের স্নায়ু শিথিল, মস্তিস্ক অলস ও হৃদয় দুর্বল হওয়ার কারণে বেশি বেশি অবান্তর কথা বলেন। শেখ হাসিনার বিনাভোটের সরকার অসংখ্য মানুষকে গুম, খুন, অপহরণ করেছে। এদের মধ্যে জাতিসংঘ গুমের একটি তালিকা দিয়েছিল। আজ পর্যন্ত বিনাভোটের সরকার এর কোনো জবাব দিতে পারেনি।
বন্ধুরা,
মিথ্যা মামলায় অন্যায়ভাবে সাজাপ্রাপ্ত বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ—স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল কাদির ভুইয়া জুয়েল আজ আদালতে জামিন আবেদন করলে তার জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে প্রেরণের ঘটনায় আমি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি। তার মিথ্যা মামলা ও সাজা প্রত্যাহারসহ অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তির জোর আহবান জানাচ্ছি।
ধন্যবাদ সবাইকে। আল্লাহ হাফেজ।